
নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁদপুর:
এক নজরে
জামিন পেয়েও জেলগেট থেকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার।
মুক্তি পেতে ওসিকে দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের “ক্লিয়ারেন্স মানি”।
টার্গেট মূলত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
ওসি বাহার মিয়ার বিরুদ্ধে চাঁদপুরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ।
প্রশাসনের নীরবতায় বাড়ছে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও হতাশা।
চাঁদপুরে জামিনে মুক্তি পাওয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য জেলগেট যেন এক নতুন ফাঁদে পরিণত হয়েছে। আর এই ফাঁদের নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযোগের তীর চাঁদপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহার মিয়ার দিকে। তার বিরুদ্ধে উঠেছে “ক্লিয়ারেন্স মানি” নামে এক অভিনব চাঁদাবাজির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, দাবিকৃত অর্থ না দিলেই জামিনপ্রাপ্তদের জেলগেট থেকে তুলে নিয়ে নতুন কোনো গায়েবি মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা চাঁদপুরে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর থেকেই চাঁদপুর সদর থানা পুলিশের আচরণে এক ধরনের প্রতিশোধমূলক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ওসি বাহার মিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে এমন অনেক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে, যাদের নামে পূর্বে কোনো মামলা ছিল না। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিযোগটি উঠেছে জামিনে মুক্তি পাওয়াদের ঘিরে।
ভুক্তভোগী একাধিক পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, পুরনো মামলায় আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পাচ্ছেন না তারা। কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই ওসি বাহার মিয়ার নিযুক্ত কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারের কাছে “ক্লিয়ারেন্স মানি” বা মোটা অঙ্কের চাঁদার বার্তা পাঠানো হয়। যারা এই অর্থ পরিশোধে সম্মত হন, তারা নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারেন। কিন্তু যারা অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান বা ব্যর্থ হন, তাদের ভাগ্যেই জোটে জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেপ্তার।
সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েও জেলগেট থেকে পুনরায় আটক হওয়া এক ছাত্রলীগ নেতার বাবা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “অনেক কষ্টে হাইকোর্ট থেকে ছেলের জামিন করিয়েছি। ভেবেছিলাম ছেলেটা এবার বাড়ি ফিরবে। কিন্তু জেল থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই সদর থানার পুলিশ একটি সাদা গাড়িতে তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, তার নামে নাকি আগের রাতে একটি ককটেল বিস্ফোরণের মামলা দেওয়া হয়েছে। ওসি সাহেবের লোককে টাকা দিতে পারিনি, তাই আমার ছেলের জীবনটা ওরা শেষ করে দিচ্ছে।”
এই “ক্লিয়ারেন্স মানি” ফাঁদের কারণে চাঁদপুরের আওয়ামী লীগপন্থী পরিবারগুলোতে ভয় আর অনিশ্চয়তা জেঁকে বসেছে। অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তারের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, এটি নিছক আইন প্রয়োগ নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয়কে পুঁজি করে ব্যক্তিগত আক্রোশ ও আর্থিক ফায়দা লোটার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেন, কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসক মহসিন আলম কারাগার পরিদর্শন করে বন্দিদের খোঁজখবর নিলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। ওসি বাহার মিয়া তার কর্মকাণ্ড একইভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তারা জানান। তাদের প্রশ্ন, “একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এমন নির্যাতন চালাতে পারেন? দেখার কি কেউ নেই?”
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাঁদপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহার মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
চাঁদপুরের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই ঘটনাকে আইনের শাসনের ওপর চরম আঘাত বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে ক্ষমতার এমন অপব্যবহার একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে চাঁদপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি-র জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা ওসি বাহার মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগের একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।