
মাদারীপুর প্রতিনিধি
বিয়ের হাতে মেহেদির রং মুছে যাওয়ার আগেই শুরু হয়েছিল যৌতুকের দাবিতে চাপ। স্বামীকে বিদেশ পাঠানোর জন্য চাওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। বাবার পরিবারের পক্ষে সেই টাকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় নববধূ মুন্নি আক্তারের ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন—এমনই অভিযোগ তার স্বজনদের। একপর্যায়ে বিষাক্ত ওষুধ পান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুরে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাত্র চার মাস আগে বিয়ে হওয়া এই তরুণী।তবে এ ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বাড়ি ছেড়ে পলাতক রয়েছেন।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে রাজৈর উপজেলার নরারকান্দী এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে মুন্নির মরদেহ দাফন করা হয়েছে। তার মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার মাস আগে রাজৈর উপজেলার নরারকান্দী এলাকার জামাল বেপারীর কলেজ পড়ুয়া মেয়ে মুন্নি আক্তারের সঙ্গে মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর এলাকার সিকি নওহাটা গ্রামের সাদ্দাম সন্যামাত ছেলে সুমন সন্যামাতের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই মুন্নির কাছে যৌতুকের টাকা দাবি করা শুরু হয়। একপর্যায়ে স্বামী সুমনকে বিদেশে পাঠানোর জন্য মুন্নির পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয় জানানো হলে শুরু হয় চাপ ও নির্যাতন। মুন্নিকে মারধরের পাশাপাশি বিভিন্নভাবে মানসিকভাবে হেনস্তা এবং মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তার স্বজনরা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২৭ আগস্ট মুন্নিকে মারধর করে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ১০ লাখ টাকা না দিলে তাকে তালাক দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তাদের।স্বজনদের দাবি, পরদিন মুন্নির সঙ্গে তার স্বামীর কথা হয়। তখনও যৌতুকের টাকা নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং টাকা দিতে না পারলে মরে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। এর কিছুক্ষণ পর মুন্নি বিষাক্ত ওষুধ পান করেন। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বজনরা তাকে রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২৮ আগস্ট দুপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, যৌতুকের জন্য একজন নববধূকে নির্যাতনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের মতে, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহল আলমগীর হোসেন বলেন, একটি মেয়ের বিয়ের পর নতুন সংসারে নিরাপদ থাকার কথা। সেখানে যৌতুকের জন্য নির্যাতনের অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
স্বজনদের আহাজারি—‘আমরা মেয়েকে হারিয়েছি, বিচার চাই’
মুন্নির মা সাজেদা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বিয়ের পর মেয়েটি নতুন সংসার নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু যৌতুকের টাকার জন্য তাকে এভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হবে, তা আমরা কখনো ভাবিনি। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
নিহত মুন্নী আক্তারের চাচি হালিমা বেগম বলেন, “১০ লাখ টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের ছিল না। টাকা দিতে না পারায় মুন্নির ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। শেষ পর্যন্ত মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। এখন আমরা শুধু সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।”
নিহত মুন্নির বোন সাথী আক্তার বলেন, আমার বোনকে যৌতুকের টাকার জন্য আমার বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার শশুরে শাশুড়ি শাশুড়ি বেশ কয়েকজন অত্যাচার করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে এ ঘটনা আমরা সঠিক বিচার এবং দোষীদের ফাঁসি চাই।
এ বিষয় রাজৈর থানার এসআই আলী বলেন,ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুন্নির মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় দাবি—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা। মাত্র ছয় মাসের সংসারেই যে স্বপ্নের মৃত্যু হলো, তার সঠিক বিচার চান নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা।