
১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিল শুরু হওয়া অপারেশন ইগল ক্ল (Operation Eagle Claw) ছিল আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম জটিল এবং আলোচিত সামরিক অভিযান — যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানীয় বিপ্লবের সময় তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে বন্দি হওয়া নাগরিকদের মুক্ত করা। এই অভিযান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল, এবং এতে বহু প্রাণহানি ও সেনাবাহিনীর বড় লোকসানের ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে মার্কিন সামরিক নীতিতে দীর্ঘদিনের প্রভাব ফেলে।
ভিন্নধর্মী প্রেক্ষাপট: বন্দি সংকট ও ইরানীয় বিপ্লব
১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর, তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে একটি সংগঠিত হামলায় প্রায় ৫২ জন আমেরিকান কূটনীতিক ও নাগরিককে বন্দি করে ইরানীয় ছাত্রীবৃন্দ। তাঁদের আটক করার পেছনে মূল কারণ ছিল তখনকার শাহকে আমেরিকা আশ্রয় দেয়ায় ইরানীয় জনগণের ক্ষোভ এবং পশ্চিমা প্রভাবে বিরোধিতা। কয়েক মাস ধরে কূটনৈতিক আলোচনায় কোনো ফল না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
অভিযানের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি
প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসে অপারেশন ইগল ক্ল নামে একটি গোপন সামরিক অভিযান অনুমোদন করেন। এই পরিকল্পনা ছিল সবচেয়ে জটিল এবং কোয়ান্টিফাইড সামরিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি ডেল্টা ফোর্স, রেঞ্জার্স, নেভি, এয়ার ফোর্স ও মেরিনসসহ বিভিন্ন শাখার মিলিত অপারেশন অংশ নেয়ার কথা ছিল। পরিকল্পনা ছিল তেহরানের কাছাকাছি একটি মরু এলাকায় (কোডনেম ডিজার্ট ওয়ান) হেলিকপ্টার ও বিমানগুলোকে মিলিয়ে রাখার, সেখানে সৈন্যদের নিয়ে যাওয়া এবং পরে রাতের আঁধারে দূতাবাসে ঢুকে বন্দিদের মুক্ত করা।
জিৎয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হেলিকপ্টার ও সি‑১৩০ বিমানগুলো প্রথমে ডেজার্ট ওয়ানে মিলিত হবে, সেখান থেকে সৈন্যরা হেলিকপ্টারে উঠে পরবর্তী অবস্থানে যাবে এবং বন্দিদের উদ্ধারের জন্য তেহরান শহরে ঢুকবে। পরে মুক্ত বন্দিদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
অভিযানে ভয়াবহ বিপর্যয় ও ব্যর্থতা
অভিযান শুরু হয়েছিল অপ্রত্যাশিত সমস্যার মুখোমুখি হয়ে। মরুভূমিতে পৌঁছানোর পথে প্রবল ধূলিঝড় ও অপারেশনাল সমস্যার কারণে কিছু হেলিকপ্টার কাজে লাগছিল না, ফলে নির্ধারিত সংখ্যা হেলিকপ্টার পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। অপারেশনে কমপক্ষে ছয়টি হেলিকপ্টার প্রয়োজন হলেও তখন কেবল পাঁচটি কার্যকর অবস্থায় পৌঁছেছিল। তাই নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয় অভিযান বাতিল করার।
যখন টীমরা ডিজার্ট ওয়ান থেকে সরে আসছিল, তখনই একটি হেলিকপ্টার আর একটি সি‑১৩০ পরিবহন বিমান টেকনিক্যালি সংঘর্ষ করে প্রচন্ড আগুন ধরে যায়। এতে করে উভয় বিমানটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং অভিযানে অংশ নেওয়া আটজন আমেরিকান সেনাবাহিনীর সদস্য প্রাণ হারান। পরে সৈন্যদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, আর কুয়াশা ও ধুলোর কারণে এই ঘটনাটি তেহরান পর্যন্ত প্রচারিত হয়।
সেনাবাহিনীর বড় লোকসান ও প্রতিক্রিয়া
ইগল ক্ল অভিযান ছিল সফল হতে না পারলেও আন্তর্জাতিক ও দেশের অভ্যন্তরে এটি গভীর প্রভাব ফেলে। আট সেনাপ্রতিনিধির মৃত্যু এবং ৪ জনের আহত হওয়া এই ব্যর্থতা আমেরিকার সামরিক নীতি ও প্রস্তুতির অনেক দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে। বিশেষ করে ডেল্টা ফোর্স ও অন্যান্য বিশেষ বাহিনীর মিলিত প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা 부족 মোড়কে একটি বড় পাঠ হয়ে দাঁড়ায়।
পরে শিক্ষা ও সামরিক সংস্কার
অপারেশন ইগল ক্ল‑এর ব্যর্থতা পরবর্তী সময়ে আমেরিকান সামরিক স্ট্র্যাটেজিতে বড় সংস্কারের পথ খুলে দেয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র স্পেশাল অপারেশন্স কমান্ড (USSOCOM) ও Air Force Special Operations‑এর মতো আধুনিক বিশেষ বাহিনী পরিকল্পনা ও যৌথ প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে সফল বিশেষ অভিযান ও আন্তঃসেবা সমন্বয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিণতি
ইরানেও এই অভিযান দীর্ঘদিন স্মৃতিতে রয়েছে। ২০২৩ সালে তেহরানের একটি আদালত এই ব্যর্থ অভিযানের জন্য আমেরিকাকে প্রায় ৪২০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেয়, যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই রায় প্রত্যাখ্যান করে। এই রায় ইরান‑যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অতীত উত্তেজনার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হয়।
ইগল ক্লের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
অপারেশন ইগল ক্ল যদিও সফল হয়নি, এটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্পেশাল মিশন হিসেবে স্মরণীয়। বহু সামরিক ইতিহাসবিদ বলেন, এই অভিযানই ছিল আধুনিক বিশেষ বাহিনীর যৌথ কাজ ও পরিকল্পনার গুরুত্বের প্রথম বড় পরীক্ষা। তাছাড়া এটি ভবিষ্যতের মিশনগুলোকে আরও সমন্বিত, প্রস্তুত ও কার্যকর করে তুলতে সহায়তা করেছে।
অপারেশন ইগল ক্ল ছিল একটি দুঃসাহসী পরিকল্পনা — যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল ঝুঁকিতে ভরা। কিন্তু পরিণামে দেখা গেল যে ঝুঁকি ও প্রস্তুতির মধ্যে কী পরিমাণ ফারাক তৈরি হতে পারে এবং সেই ফাঁকই হতে পারে ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের কারণ। আজও এই ঘটনার গবেষণা ও আলোচনা হয়ে থাকে, যেখানে বিশেষ বাহিনীর দক্ষতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবিক মূল্য সবই জড়িত থাকে।